সোমবার ১০, আগস্ট ২০২৬

সোমবার ১০, আগস্ট ২০২৬ -- : -- --

আন্তর্জাতিক: লিবিয়ার ভয়ংকর ‘গেমঘর’ থেকে এক বছর পর ফিরলেন মাদারীপুরের দুই যুবক

প্রকাশিত: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৪ পিএম

2014

আন্তর্জাতিক: লিবিয়ার ভয়ংকর ‘গেমঘর’ থেকে এক বছর পর ফিরলেন মাদারীপুরের দুই যুবক

দৈনিক অদম্য বার্তা ডেস্ক: ঢাকা রোববার ০৯ আগস্ট ২০২৬ || শ্রাবণ ২৫ ১৪৩৩ || ২৬ সফর ১৪৪৮ হিজরি

ঘটনাবলির বিস্তারিত বিবরণ

বেলাল রিজভী, মাদারীপুর || .কম

ভুক্তভোগী আরাফাত কাজী ও রাহাত তালুকদার

ইউরোপের দেশ ইতালিতে গিয়ে ভালো চাকরির মাধ্যমে সংসারের অভাব মেটানো ও মা-বাবার মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন ছিল মাদারীপুরের রাহাত তালুকদার (২৮) ও আরাফাত কাজীর (২৫)। তাদের পরিবার বিক্রি করেছে জমিজমা, নিয়েছে ঋণ। শেষ সম্বলটুকুও তুলে দিয়েছে দালালদের হাতে। কিন্তু ইতালির বদলে তাদের যাত্রা থেমে যায় যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ায়। সেখানে একের পর এক হাতবদল হয়ে তারা পৌঁছান কথিত ভয়ংকর ‘গেমঘরে’। এরপর স্বপ্নের জায়গা নেয় ভয়, আতঙ্ক আর নির্যাতন।

ইতালির স্বপ্ন দেখিয়ে লিবিয়ায়, প্রতারণার শিকার এক ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক

ইতালি নেওয়ার নামে লিবিয়ায়, তিন মাস ধরে নিখোঁজ যুবক

হাত-পা বেঁধে মারধর, মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে চিৎকার বন্ধ করা, প্লাস্টিক ও লোহার পাইপ দিয়ে পেটানো, সিগারেটের আগুনে শরীর পোড়ানো, গরম লোহা দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়াসহ নানা ধরনের নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন দেশে ফিরে আসা এই দুই যুবক। তাদের অভিযোগ, নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে পরিবারের কাছে পাঠানো হতো। এরপর সেই ভিডিও দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হতো। টাকা না দিলে নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেওয়া হতো।

প্রায় এক বছর পর গত ৮ আগস্ট দেশে ফিরেছেন রাহাত তালুকদার (২৮) ও আরাফাত কাজী (২৫)। বর্তমানে তারা মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রবিবার (৯ আগস্ট) সকালে হাসপাতালে গিয়ে কথা হয় তাদের সঙ্গে।

হাসপাতালের শয্যায় বসে লিবিয়ার বন্দীজীবনের সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন রাহাত তালুকদার। চোখেমুখে স্পষ্ট ছিল আতঙ্কের ছাপ। রাহাত সবিস্তারে উল্লেখ করেন, “প্রতিদিন পালা করে তিন বেলা মারধর করত। মারার আগে হাত-পা বেঁধে ফেলত। মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে দিত, যাতে চিৎকার করতে না পারি। কখনো প্লাস্টিকের পাইপ, আবার কখনো লোহার পাইপ দিয়ে পেটাত।”

তিনি সবিস্তারে উল্লেখ করেন, “সিগারেটের আগুন দিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গা পুড়িয়ে দিত। এমনকি হাতের নখও তুলে ফেলেছে।” নির্যাতনের সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে কিছুক্ষণ নীরব থাকেন রাহাত। পরে সবিস্তারে উল্লেখ করেন, “বাড়িতে ফোন দিয়ে টাকা দিতে বলত। টাকা না দিলে নির্যাতন আরো বাড়িয়ে দিত। একবেলা খাবার দিত। একটা ঘরে ৪০০ থেকে ৫০০ জনের মতো মানুষকে আটকে রাখা হতো। দিন-রাতের হিসাবই ভুলে গিয়েছিলাম।”

নির্যাতনের কারণে এখনো অনেক ঘটনা ঠিকমতো মনে করতে পারেন না তিনি। রাহাত সবিস্তারে উল্লেখ করেন, “অনেক কিছুই এখন ঠিকমতো মনে করতে পারি না। তারপরও আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, আমরা জীবিত দেশে ফিরতে পেরেছি।”

রাহাতের পরিবারের দাবি, ২০২৫ সালের মার্চের দিকে স্থানীয় কয়েকজন দালাল বাড়িতে এসে তাকে ইতালিতে পাঠানোর প্রস্তাব দেন। বলা হয়, ইতালিতে গেলে ভালো বেতনের চাকরি হবে এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হবে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মজিবর শেখ, শামসু ফকির ও মাহাবুব মুন্সির মাধ্যমে মূল দালাল সুমনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। প্রথমে প্রায় ২২ লাখ টাকার বিনিময়ে ইতালি পাঠানোর কথা হয়। পরে লিবিয়ার একটি চক্রের কাছে তাকে বিক্রি করে দেওয়ার পর আরো প্রায় ২৫ লাখ টাকা নেওয়া হয় বলে পরিবারের অভিযোগ।

ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে গিয়ে পরিবারের শেষ সম্বল পর্যন্ত বিক্রি করতে সম্পন্ন হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন স্বজনরা। রাহাত সবিস্তারে উল্লেখ করেন, “আমরা বিশ্বাস করেছিলাম ইতালিতে যাব। ভালো কাজ করব, পরিবারকে টাকা পাঠাব। কিন্তু লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর বুঝতে পারি, আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করা সম্পন্ন হয়েছে।”

পরিবারের অভিযোগ, লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর রাহাতকে একটি সশস্ত্র চক্রের কাছে তুলে দেন দালাল সুমন বেপারী। পরে তাকে অন্য একটি চক্রের কাছে বিক্রি করা হয়। একপর্যায়ে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন কথিত ‘গেমঘরে’ তাকে আটকে রাখা হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় নির্যাতন ও মুক্তিপণের দাবির নতুন অধ্যায়। পরিবারের দাবি, রাহাতের নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে আরো প্রায় ২৫ লাখ টাকা আদায় করা সম্পন্ন হয়েছে।

রাহাতের মা মায়া বেগমের কাছে ছেলেকে বিদেশে পাঠানো ছিল সংসারের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নই একসময় তার জীবনের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়ায়। তিনি সবিস্তারে উল্লেখ করেন, “ছেলের জীবনটা সুন্দর হবে, সংসারের হাল ধরবে- এই আশা নিয়েই বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। পরে জানতে পারি, ইতালিতে নয়, লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে তাকে আটকে রাখা সম্পন্ন হয়েছে।”

কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন মায়া বেগম। তিনি সবিস্তারে উল্লেখ করেন, “ছেলের নির্যাতনের ভিডিও যখন দেখেছি, তখন মনে সম্পন্ন হয়েছে আমার বুকের ভেতরটা কেউ ছিঁড়ে ফেলছে। ওকে বাঁচানোর জন্য যা ছিল সব দিয়েছি। ধার করেছি, মানুষের কাছে হাত পেতেছি। অনেক দিন পর্যন্ত জানতাম না আমার ছেলে বেঁচে আছে কি না।”

এরপর কিছুটা স্বস্তির সুরে তিনি সবিস্তারে উল্লেখ করেন, “অবশেষে আমার ছেলেকে আমি কাছে পেয়েছি। আল্লাহর কাছে লাখো শুকরিয়া।’ তার আকুতি, “আমি শুধু চাই, যারা আমার ছেলেসহ অন্যদের এই অবস্থায় ফেলেছে, তাদের বিচার হোক। আর কোনো মা যেন এভাবে সন্তানের জন্য অপেক্ষা না করেন।”

রাহাতের দুলাভাই জামাল মাতুব্বর সবিস্তারে উল্লেখ করেন, “নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে একের পর এক টাকা দাবি করা সম্পন্ন হয়েছে। পরিবারের সবাই মিলে টাকা জোগাড় করেছি। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও দীর্ঘ সময় রাহাতের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো তাকে আর জীবিত পাব না।” তিনি সবিস্তারে উল্লেখ করেন, “রাহাত আমাদের মাঝে ফিরে এসেছে। কিন্তু আমরা এই দালালদের বিচার চাই।”

রাহাতের মতোই আরাফাত কাজীর গল্পও ইতালির স্বপ্ন দিয়ে শুরু হয়ে শেষ সম্পন্ন হয়েছে লিবিয়ার বন্দীশালায়। আরাফাত সবিস্তারে উল্লেখ করেন, “আমাদের সঙ্গে যারা ছিল, তারা বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছিল। সবারই স্বপ্ন ছিল ইতালিতে যাওয়ার। কিন্তু সেখানে গিয়ে বুঝলাম আমরা বন্দী।”

তার ভাষ্য, “হাত-পা বেঁধে মারধর করত। মুখে টেপ লাগিয়ে দিত। চিৎকার করলেও কেউ শুনতে পেত না। বাড়িতে ফোন দিয়ে টাকা আনতে বলত। টাকা না এলে আবার নির্যাতন করত।”

আরাফাতের অভিযোগ, তাকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা সম্পন্ন হয়েছে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে গরম লোহা দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া সম্পন্ন হয়েছে। তিনি সবিস্তারে উল্লেখ করেন, “এখনো শরীরে সেই ছ্যাঁকার দাগ আছে। পায়ের তলা পিটিয়ে ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখনো খালি পায়ে হাঁটতে পারি না। পায়ে ব্যথা করে, হাঁটলে জ্বালা করে।”

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরাফাতের শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতনের চিহ্ন এখনো দেখা যায় বলে নিশ্চিত করেন তার স্বজনরা।

আরাফাতের বড় ভাই মাহাবুব কাজী সবিস্তারে উল্লেখ করেন, ভাইকে বাঁচাতে তাদের পরিবার সর্বস্ব হারিয়েছে। তিনি সবিস্তারে উল্লেখ করেন, “জমিজমা বিক্রি করেছি, ঋণ করেছি। সব মিলিয়ে দালাল সুমন বেপারীকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা দিয়েছি। স্থানীয় তিন দালাল- মাহাবুব মুন্সি, শামসু ফকির ও মজিবর শেখের মাধ্যমে এসব টাকা দেওয়া সম্পন্ন হয়েছে।”

মাহাবুবের অভিযোগ, “এত টাকা দেওয়ার পরও ভাইকে ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল না। আজ আমরা আমার ভাইকে ফিরে পেয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ। আমরা প্রতারণার বিচার চাই। যারা টাকা নিয়েছে, তাদের আইনের আওতায় এনে আমাদের টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করা হোক।”

মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদী ইউনিয়নের পূর্ব টুবিয়া গ্রামে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদেশে যাওয়ার নামে লিবিয়ায় পাচারের শিকার সম্পন্ন হয়েছেন- এমন পরিবারের সংখ্যা কম নয়। স্থানীয়দের দাবি, গ্রামের অর্ধশতাধিক যুবক কোনো না কোনোভাবে বিদেশে পাঠানোর নামে দালালচক্রের ফাঁদে পড়েছেন। কারো ছেলে নিখোঁজ, কারো ভাই বন্দী, আবার কেউ মুক্তিপণ দেওয়ার পরও স্বজনের সন্ধান পাননি।

এলাকাবাসী জুবায়ের তালুকদার, মহাসিন তালুকদার ও সিয়াম তালুকদার সবিস্তারে উল্লেখ করেন, “দালালরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিদেশে ভালো চাকরি ও উন্নত জীবনের কথা বলত। তাদের কথা বিশ্বাস করে মানুষ জমি বিক্রি করেছে, ঋণ করেছে। এখন অনেক পরিবার নিঃস্ব।”

তারা সবিস্তারে উল্লেখ করেন, “শুধু স্থানীয় দালালদের ধরলে হবে না। এই চক্রের পেছনে থাকা মূল হোতাদেরও খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে।”

স্থানীয় বাসিন্দা আসাদ ও সুজন সবিস্তারে উল্লেখ করেন, “বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নকে কাজে লাগিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা ছাড়া এ ধরনের পাচার বন্ধ করা সম্ভব নয়।”

মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব সবিস্তারে উল্লেখ করেন, “ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা সম্পন্ন হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।”

তিনি সবিস্তারে উল্লেখ করেন, “অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”

রাহাত ও আরাফাতের গল্প শুধু দুই যুবকের বন্দীজীবনের গল্প নয়; এটি বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নকে ঘিরে গড়ে ওঠা ভয়ংকর এক বাণিজ্যেরও প্রতিচ্ছবি।

এ সপ্তাহের রাশিফল (৮-১৪ আগস্ট)

কালীগঞ্জের আলোচিত ওসি জেল্লাল হোসেন প্রত্যাহার

ঢাকার বাইরে উন্নত চিকিৎসায় চীনের সহায়তায় ২০ হাসপাতাল

ঠিকানা: ১৯৮-১৯৯, মাজার রোড, মিরপুর-১, ঢাকা ১২১৬

একটি স্কাইরুট মিডিয়া লিমিটেডের প্রতিষ্ঠান

মার্কেটিং : +৮৮-০১৬৮৬৬৯৩৫৪৯ +৮৮-০১৬৮৬৬৯০২৬৬

Install for faster, offline access

Link copied!