রবিবার ১৭, মে ২০২৬

রবিবার ১৭, মে ২০২৬ -- : -- --

বৈশ্বিক অস্থিরতা ও বাংলাদেশের কৃষি: স্বনির্ভরতার নতুন চ্যালেঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৯:৪৭ এএম

2482

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরাইলের চলমান উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

 

বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অংশ এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সামরিক বা কূটনৈতিক সংঘাত সরাসরি জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এর প্রভাব পড়ে সার উৎপাদন, পরিবহন ব্যয়, খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল এবং কৃষি উৎপাদনের ওপর।
বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর অর্থনীতির জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি, সার ও কৃষি উপকরণের মূল্য পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের কৃষি খাতে দ্রুত ও বহুমাত্রিকভাবে প্রতিফলিত হতে পারে।
বাংলাদেশের কৃষি কাঠামো এখনও প্রধানত ধাননির্ভর। দেশের মোট আবাদি জমির প্রায় ৮১ শতাংশে ধান চাষ হয়, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি। বোরো মৌসুমে উৎপাদিত ধান দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৫৫–৫৮ শতাংশ সরবরাহ করে এবং এই উৎপাদন প্রায় সম্পূর্ণভাবে সেচনির্ভর।
দেশে বর্তমানে প্রায় ১৬–১৭ লাখ সেচযন্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে, যার বড় অংশই ডিজেলচালিত। একই সঙ্গে বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্রের ব্যবহারও ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনও মূলত গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল, যার অধিকাংশই আমদানি করতে হয়।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেলে সেচ ব্যয় বেড়ে যায়। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায় এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্যের বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি হয়।
এই বাস্তবতায় সেচ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এখন অত্যন্ত জরুরি। প্রচলিত পদ্ধতিতে সেচের ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পানি ব্যবহার করা হয়, যা একদিকে জ্বালানি অপচয় বাড়ায়, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামিয়ে আনে।
ধান চাষে Alternate Wetting and Drying (AWD) পদ্ধতি প্রয়োগ করলে প্রায় ২০–৩০ শতাংশ পানি সাশ্রয় করা সম্ভব। এর ফলে ডিজেল ও বিদ্যুতের ব্যবহার কমে এবং উৎপাদন ব্যয়ও হ্রাস পায়। পাশাপাশি সমবায় ভিত্তিক সৌরচালিত সেচ পাম্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা প্রদান করলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশের কৃষিতে সারের ব্যবহারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে এর অপচয়ের মাত্রা তুলনামূলক বেশি। সরকার প্রতিবছর প্রায় ২৫,০০০–৩০,০০০ কোটি টাকার কৃষি ভর্তুকি প্রদান করে, যার বড় অংশ রাসায়নিক সার আমদানি ও বিতরণে ব্যয় হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রয়োগ করা ইউরিয়া সারের কার্যকারিতা সাধারণত প্রয়োগকৃত পরিমাণের মাত্র ২৫–৩০ শতাংশ। অদক্ষ ব্যবস্থাপনায় প্রায় ৭০–৭৫ শতাংশ নাইট্রোজেন অপচয় হতে পারে।
প্রচলিতভাবে ইউরিয়া ছিটিয়ে প্রয়োগ করলে নাইট্রোজেন উদ্বায়ন (Volatilization), লিচিং (Leaching) এবং ডিনাইট্রিফিকেশন (Denitrification) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নষ্ট হয়ে যায়।
এই অপচয় কমাতে চারা রোপণের ৭–১০ দিনের মধ্যে ইউরিয়া সার মাটির ৭–১০ সেন্টিমিটার গভীরে সঠিক পদ্ধতিতে প্রয়োগ করা অত্যন্ত কার্যকর। এতে প্রায় ২০–৩০ শতাংশ ইউরিয়া সাশ্রয় করা যায় এবং ১০–১৫ শতাংশ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধি সম্ভব। পাশাপাশি অতিরিক্ত ইউরিয়া প্রয়োগ গাছকে দুর্বল করে এবং রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বাড়িয়ে দেয়—তাই সঠিক ব্যবহার পদ্ধতি জনপ্রিয় করা জরুরি।
বাংলাদেশের কৃষিতে আরেকটি বড় সমস্যা হলো পোস্ট-হারভেস্ট ক্ষতি। ধান কাটার পর থেকে সংরক্ষণ পর্যন্ত প্রায় ১০–১৫ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়। তবে কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহার, সঠিক সময়ে ধান কাটা, উন্নত শুকানো প্রযুক্তি এবং নিরাপদ সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এই ক্ষতি ৫–১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব।
মাঠ থেকে ধান সংগ্রহের পর দ্রুত ১২–১৪ শতাংশ আর্দ্রতায় শুকানো, সাইলো বা উন্নত ধানের গোলা ব্যবহার এবং আদর্শ বীজতলা ও সুস্থ চারা রোপণের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ের অপচয়ও কমানো যায়।
বীজ খাতেও বাংলাদেশের আমদানি নির্ভরতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। হাইব্রিড ধানের একটি বড় অংশ এখনও বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়, যা অনেক সময় নিম্নমানের হয়ে থাকে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও স্থানভিত্তিক ধানের জাত দ্রুত কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
কৃষক পর্যায়ে বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং গুণগত মানও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
একইভাবে কীটনাশকের ক্ষেত্রেও আমদানি নির্ভরতা বেশি। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকরা অতিরিক্ত ও অবৈজ্ঞানিকভাবে কীটনাশক ব্যবহার করেন, যা উৎপাদন খরচ বাড়ায় এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
গবেষণায় দেখা গেছে, ধানের জমিতে প্রথম ৪০ দিনে কীটনাশক ব্যবহার না করলেও বড় ধরনের ক্ষতি হয় না; বরং এতে উপকারী পোকামাকড়ের সংখ্যা বাড়ে এবং প্রাকৃতিকভাবে ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়। Integrated Pest Management (IPM) পদ্ধতি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কীটনাশক ব্যবহার কমানো গেলে আমদানি ব্যয় কমবে এবং পরিবেশ সুরক্ষাও নিশ্চিত হবে।
ধান প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থাতেও কিছু সংস্কার প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মিলিং করে মোটা চালকে চিকন চাল হিসেবে বাজারজাত করার প্রবণতা রয়েছে, যা চালের অপচয় বাড়ায় এবং ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করে। এতে প্রায় ৮–১০ শতাংশ পর্যন্ত চালের ওজন কমে যেতে পারে। কার্যকর মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজার তদারকি জোরদার করলে এই অপচয় কমানো সম্ভব।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে—আমদানি নির্ভর কৃষি ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
ধানের পাশাপাশি ডাল, তেলবীজ, ভুট্টা এবং অন্যান্য ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষি বহুমুখীকরণ এবং স্থানীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল করতে পারে।
এক্ষেত্রে সরকারের জন্য একটি সমন্বিত কৃষি নীতি গ্রহণ করা জরুরি, যেখানে জ্বালানি, পানি, সার, প্রযুক্তি ও বাজারকে একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হবে। স্বল্পমেয়াদে ভর্তুকি ও প্রণোদনা অব্যাহত রাখতে হলেও দীর্ঘমেয়াদে লক্ষ্য হতে হবে দক্ষতা বৃদ্ধি, অপচয় হ্রাস এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করে কম ইনপুট নির্ভর এবং জলবায়ু সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করতে হবে। পাশাপাশি কৃষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা প্রয়োজন।
রিমোট সেন্সিং, স্যাটেলাইট ডেটা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন, সেচ ব্যবস্থাপনা এবং বাজার বিশ্লেষণ আরও কার্যকরভাবে করা সম্ভব। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি দ্রুত কৃষকের মাঠে পৌঁছাবে।
ইরান–ইসরাইল উত্তেজনা বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। সংকট হয়তো সাময়িক, কিন্তু এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে—বৈশ্বিক অস্থিরতার যুগে টেকসই ও স্বনির্ভর কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প নেই।
সঠিক নীতি, সময়োপযোগী বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এই সংকটই বাংলাদেশের কৃষিকে আরও আধুনিক, দক্ষ এবং টেকসই রূপান্তরের পথে এগিয়ে নিতে পারে।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং প্রকল্প পরিচালক, এলএসটিডি প্রকল্প
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)

Link copied!