প্রকাশিত: ১১ মার্চ ২০২৬, ০২:১৮ পিএম
2073
রবিবার ১৭, মে ২০২৬ -- : -- --
খোন্দকার শাহিদুল হক
রমজান মাস ইসলামের দৃষ্টিতে অতুলনীয় ফজিলত ও বরকতের মাস। পবিত্র হাদিসে বর্ণিত আছে, এ মাসে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ রাখা হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়।
যে ব্যক্তি ঈমান ও নিষ্ঠার সাথে রোজা পালন করে, তার অতীতের গুনাহ ক্ষমা হওয়ার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। এ মাসেই নাজিল হয়েছে পবিত্র কোরআন। তাই রমজান শুধু সংযমের মাস নয়, এটি ইবাদত, তওবা, দান-সদকা এবং আত্মশুদ্ধির বিশেষ সময়।
ইসলামি ঐতিহ্যে রমজানকে তিনটি ভাগে বর্ণনা করা হয়। প্রথম দশক রহমতের, দ্বিতীয় দশক মাগফেরাতের এবং তৃতীয় দশক নাজাতের। এই ধারাবাহিকতা মানুষের আত্মিক যাত্রার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রথমে আল্লাহর রহমত বান্দাকে ঘিরে ধরে, তারপর বান্দা নিজের ভুল-ত্রুটি উপলব্ধি করে ক্ষমা প্রার্থনা করে, এবং শেষপর্যন্ত মুক্তির আশায় আল্লাহর দিকে ফিরে যায়।
রমজানের শেষ দশকের বিশেষ মর্যাদা আছে। এই সময়েই রয়েছে লাইলাতুল কদরের মতো মহিমান্বিত রাত, যে রাতকে কোরআনে হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। এই রাত মানুষের জীবনে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সুযোগ এনে দেয়। আন্তরিক দোয়া, ইবাদত ও আত্মসমালোচনার মাধ্যমে একজন মানুষ নিজের জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলার প্রেরণা পেতে পারে।
রমজান মাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবিকতা ও সহমর্মিতা। রোজাদার মানুষের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার অভিজ্ঞতা তাকে অন্যের অভাব উপলব্ধি করতে শেখায়। তাই এই মাসে ইফতার করানো, দান-সদকা করা এবং দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে অত্যন্ত সওয়াবের কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য রমজান এক বিশেষ সুযোগ এনে দেয়।
তবে রমজানের শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই মাস মানুষকে বৃহত্তর মানবতার দিকেও দৃষ্টি দিতে শেখায়। পৃথিবীর নানা প্রান্তে যখন মানুষ কষ্ট, সংঘাত বা অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করে, তখন একজন রোজাদার হৃদয়ে সহমর্মিতার অনুভূতি জাগ্রত হওয়া স্বাভাবিক। রমজান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবিকতা ছাড়া ইবাদতের সৌন্দর্য পূর্ণতা পায় না।
দুঃখজনকভাবে, কখনো কখনো মুসলিম সমাজের মধ্যেই বিভাজন ও মতভেদের কঠোরতা দেখা যায়। কিন্তু ইসলামের মূল শিক্ষা মানুষকে পরস্পরের প্রতি সম্মান, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্বের পথে আহ্বান করে। ঈমানের মৌলিক বিশ্বাসে যারা এক, তাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু তা যেন বিদ্বেষ বা অবমাননায় পরিণত না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা দরকার।
আজকের পৃথিবীতে রমজানের শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। এই মাস আমাদের শেখায় আত্মসংযম, ন্যায়বোধ, মানবিকতা এবং শান্তির মূল্য। যদি আমরা রমজানের প্রকৃত চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারি, তবে তা শুধু ব্যক্তিজীবন নয়, সমাজ ও বিশ্বমানবতার জন্যও কল্যাণকর হয়ে উঠতে পারে।
রমজানের শেষ প্রান্তে এসে তাই আমাদের প্রত্যাশা হোক শান্তি, সহমর্মিতা এবং মানবিক জাগরণ। যুদ্ধ, বিদ্বেষ ও বিভাজনের পরিবর্তে মানুষ মানুষকে বোঝার চেষ্টা করুক। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিক।
কারণ রমজানের মূল শিক্ষা হলো আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ। আর সেই নৈকট্যের পথে মানবিকতা, ন্যায়বোধ ও শান্তির মূল্যবোধই মানুষের সত্যিকারের শক্তি হয়ে ওঠে।
খোন্দকার শাহিদুল হক